আজ || মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২
শিরোনাম :
  শ্যামনগরে উত্তরণের বিশ্ব শিশু অধিকার সপ্তাহ উদযাপন       তালায় জাতীয় কন্যা শিশু দিবস পালিত       ‘অভিযোগ পেলেই কেবল ব্যবস্থা’       তালায় বিভিন্ন পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেন সংসদ সদস্য এ্যাড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ       তালায় সাবেক সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমানের পূজা মন্ডপ পরিদর্শন       তালায় বিভিন্ন পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস       তালায় বিভিন্ন পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির       সাংবাদিক তোয়াব খানের মৃত্যুতে তালা প্রেসক্লাবের শোক       তালায় কেন্দ্রীয় পানি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত       সাতক্ষীরায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে চ্যানেল আই’র ২৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন    
 

উত্তরণের এডুকো প্রকল্পের কল্যাণে……


সফল হওয়ার পথে জান্নাতুল নাইমের স্বপ্ন!

গাজী জাহিদুর রহমানঃ
জান্নাতুন নাইম মীম (১৮) সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামের মোঃ জামাল উদ্দীন গাজী ও আমেনা খাতুনের কনিষ্ঠ পুত্র। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিষ্পেশিত দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার এক পাশে খোলপেটুয়া নদী ও অপর পাশে কপোতাক্ষ নদ যেমন গাবুরাকে মায়ের মমতায় আগলিয়ে রেখেছে, তেমনি কখনও আবার হিংস্র রূপধারণ করে সকল রাগঝাড়ে অতিআদরে আগলে রাখা ঐ গাবুরার উপর। এই ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদীর কোলঘেঁষে লম্বাভাবে গড়ে ওঠা গ্রামটির নাম সোরা। এই গ্রামেই মীমের জন্ম।
জান্নাতুল নাইম মীম জানায়, পরিবারের সকলে মিলে নয় জনের সংসার তাদের। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সে সকলের ছোট। যখন তার স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়স হল ঠিক তখনই প্রাকৃতিক দুর্যোগ আইলা আঘাতহানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায়। লেখাপড়া ও স্কুল কি তা বোঝার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয় আরও তিন বছর। আইলার পানিতে তার এলাকা তলিয়ে গেলে সে পরিবারের সাথে শ্যামনগর চলে আসে। আট বছর বয়সে সে স্কুলে গেলেও প্রাইমারীর গন্ডি কোন রকমে পার করলেও পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পর মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হওয়া হয়নি তার। বাবার সাথে কাজে নেমে পড়ে সে।
মীম আরও জানায়, মাথা তুলে দাঁড়ানো সংসারটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘আইলা’র ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়ে লোনা পানির নীচে ডুবিয়ে রাখে প্রায় তিন বছর। উপার্জন হয় এমন কাজের অভাব দেখা দিলে, অনাহারে অর্ধাহারে কোন রকমে দিন কাটাতে থাকে তারা। অভাব লেগেই থাকে সংসারে। তার পিতা অন্যের মাছের ঘেরে পাহারাদারের কাজ করে প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা উপার্জন করে। আর বড় ভাই একটা ছোট দোকান চালিয়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার ৫শত টাকা আয় করে। এই বৃহৎ সংসারে অল্প উপার্জনে তাদের চলে না। ছোট একটা জাল নিয়ে নাইমও নেমে পড়ে খরস্রোতা খোলপেটুয়া নদীর বুকে। জোয়ার-ভাটার সময় সে জাল টেনে গলদা ও বাগদা চিংড়ীর রেনু সংগ্রহ করে। এভাবে প্রতিদিন সে ৫০-১২০ টাকা আয় করতে পারে। যে সময়ে তার স্কুলে লেখাপড়া করার কথা, বন্ধুদের সাথে খেলা করার কথা, সেই বয়সে উপার্জন করার জন্য দিনের অধিকাংশ সময় তাকে ঝুঁকিপূর্ণ নদীতে কাটাতে হয়।
খোলপেটুয়া নদীর তীরে ৯ নং সোরা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় দুই কক্ষের ছোট একটা কুঁড়েঘরে পরিবারের অন্যান্যদের সাথে নাইমের বসবাস। মাটির ভীত, কাঠের বেড়া আর এ্যাডবেষ্টারের ছাউনির ঘরটি যেন আর কোন দুর্যোগের ভার সইতে পারবেনা, এমনই জানান দেয় সব সময়।
বে-সরকারী সংস্থা উত্তরণ স্কুল করার জন্য ঐ এলাকায় জরিপ করপশ যায়। এ সময় স্কুল হতে ঝরেপড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু হিসাবে জান্নাতুল নাইম মীমকে নির্বাচন করা হয় এবং দৃষ্টিনন্দন ব্রীজ স্কুলে তাকে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। ব্রীজ স্কুলে পড়ার পাশাপাশি তাকে উত্তরণের কারিগরী প্রশিক্ষণ স্কুলের ইলেক্ট্রনিক্স ও মোবাইল সার্ভিসিং কোর্সে ভর্তি করানো হয়। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সে তিন মাসের ইলেক্ট্রনিক্স ও মোবাইল সার্ভিসিং কোর্স সম্পন্ন করে। ট্রেনিং শেষে অল্পকিছু মালামাল ক্রয় করে বাড়িতে বসে মোবাইল মেরামতের কাজ শুরু করেছে। খুব শীঘ্রই একটা দোকান করতে চায় মীম। সে নষ্ট মোবাইল মেরামতের পাশাপাশি নতুন মোবাইলও বিক্রি করতে চায়। এভাবে সে ভবিষ্যতে একজন দক্ষ ব্যবসায়ী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। বাবার অভাবের সংসারের হাল ধরার পাশাপাশি মানুষের মত মানুষ হতে চায় মীম। তার মত কোন শিশুকে যেন অল্পবয়সে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে না তার জন্যেও সে কাজ করতে চায়। আত্মবিশ^াসী জান্নাতুল নাইম মীম এখন সফলতার স্বপ্ন দেখে, এগিয়ে যেতে চায় সফলতার সিঁড়ি বেয়ে।
উত্তরণের এডুকো প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক নাজমা আক্তার বলেন, শ্যামনগর উপজেলায় গাবুরা, মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনি ও কাশিমাড়ী ইউনিয়নে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই চার টি ইউনিয়নের চারটি লার্নিং সেন্টারে ৩৫০ জন শ্রমজীবী শিশুকে শিক্ষাদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই শিশুরা নিয়মিত লার্নিং সেন্টারে এসে লেখাপড়া করছে এবং এরমধ্য থেকে ২৫ জন ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সুইং মেশিন ও টেইলরিং এবং ২৫ জন ইলেকট্রনিকস ও মোবাইল সার্ভিসিংয়ের বিষয়ে তিন মাসের কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে।
শ্যামনগর উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সোহাগ হোসেন জানান, মূলত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত স্কুল বহির্ভূত শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতে আনার জন্যই এ ব্যবস্থা। এটি দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া উপকূলীয় এলাকায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস ও মোবাইল সার্ভিসিং এবং সুইং মেশিন ও টেইলরিং প্রশিক্ষণ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ বল মনে করেন তিনি।
গাবুরার স্থানীয় ইউপি সদস্য মঞ্জুর এলাহী বলেন, এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে উত্তরণের এডুকো প্রকল্প।


Top