ব্রেকিং নিউজঃ

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষায় আপোষহীন নেতা

‘বালু ভাই’ সাংবাদিকদের কাছে শুধূ নয় কপিলমুনিবাসীর কাছেও তিনি ছিলেন অতি পরিচিত ও আপনজন

শেখ আব্দুস্ সালাম :

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০, ০০:৪৫
  • ৩৯

নানা ঘটনা-অঘটনার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছে এ পৃথিবী। যার সামান্য কিছু আমাদের সামনে ধরা পড়ে আবার এমন অনেক কিছুই রয়ে যায় সবার অগোচরে। তবে যতটুকু আমরা জানতে পারি তা সংবাদ মাধ্যম গুলোর কল্যাণে। তাই এ মাধ্যমে কাজ করে অনেকে হয়েছেন খ্যাতিমান। সাংবাদিকতাকে বলা হয় মহৎ পেশা। হয়তো এই মহত্ত্বটুকুই এ পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সাহস ও শক্তির উৎস। এ জন্যই একটি সঠিক সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি নিতেও কার্পন্য করেন না তারা। প্রয়োজনে নিজের জীবনও বিপন্ন করেন। দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন প্রকৃত ঘটনা, আসল সত্য। সত্য তুলে ধরতে তাদের সব সময় বাধা দেয় অপশক্তি। কিন্তু ক্ষমতাবান আর ঘাতকদের ছায়া দেখে তারা গর্তে পালান না, সত্যের পক্ষে সব সময় থাকেন নির্ভিক। দেশের সাধারণ মানুষই তাদের ভরসা এবং অবলম্বন। তেমনই একজন খ্যাতিমান সাহসী সাংবাদিকতার অগ্রদূত হুমায়ূন কবির বালু।

২৭জুন,০৪ দুপুরে আনন্দঘন মূহুর্তে যাকে নিজ পত্রিকা অফিসের প্রবেশ মূখে আততায়ীর ছোড়া বোমার আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে। দুনিয়া জুড়ে সাংবাদিক হত্যা, জেল জুলুম চলছে এভাবেই। অপরাধী চক্র, রাজনৈতিক সংগঠন, সরকারের গোপন সংস্থার প্রতিহিংসা, আক্রোশ আর ক্রোধের শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা। প্রাণ হারাতে হচ্ছে তাদের কখনো গোপনে, কখনো প্রকাশ্যে। পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ সারা জীবনের জন্য। কি ফিলিপাইন, কি আয়ারল্যান্ড, কি বলিভিয়া, কি আমার দেশ… সবখানেই সাংবাদিকদের পিছনে লেগে আছে রক্তলোলুপ খড়গ হাতে গুপ্তঘাতক, ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে প্রতিনিয়ত।
আমার সাংবাদিকতা জগতের পরম শ্রদ্ধেয় অভিভাবক হুমায়ুন কবীর বালু শুধু একজন সম্পাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষায় আপোষহীন নেতা।

তাঁকে নিয়ে স্মৃতি চারণের ব্যার্থ চেষ্টা করতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে দেখছি দুরের মানুষ কাছে এলো, কাছের মানুষ দুরে হারিয়ে গেল। অতীতের কত সুখ-স্মৃতি নির্বাসিত হলো মন থেকে, আবার কত সামান্য টুকরো টুকরো ঘটনা, স্মৃতি, ক্ষণিকের দেখা মানুষ মৌরসী পাট্টা নিয়ে আমার মনে পাকা আসন বিছিয়ে নিয়েছে। কিছু স্মৃতি, কিছু কাহিনী, কিছু আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখের অনুভূতি কোন দিনই হারিয়ে যায়নি, যাবে না।

বালু ভাই তিন তিনবার কপিলমুনিতে এসেছিলেন। দীর্ঘ সময় ব্যায় করে অনুষ্ঠান করেছেন। সাংবাদিকদের কাছে শুধূ নয় অবহেলিত বিস্তীর্ণ এই জনপদের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অতি পরিচিত ও আপনজন।
১৮ নভেম্বর ’৯৪ সালে বালু ভাই জন্মভূমি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাইকগাছা সফরকালে আমাদের কপিলমুনি প্রেসক্লাবে পদধুলি দেন। তিনি স্থাণীয় সাংবাদিকদের সাথে মত বিনিময় শেষে প্রেস ক্লাবের পরিদর্শন বইতে নিজে হাতে লিখেছিলেন –
“সময়ের তালে সব যায় হারিয়ে রয়ে যায় স্মৃতি এই জন্মভূমি, এই বাংলাদেশ। গ্রাম বাংলার অনেক এলাকার মত একটি ঐতিহ্যের এলাকা কপিলমুনি, এই জন্মভূমিতে জন্মেছে ইতিহাস খ্যাত রায় সাহেব বিহারী সাধু। সেই এলাকার প্রেস ক্লাবে এসে দৈনিক জন্মভুমি’র পক্ষ থেকে আমরা ধন্য। প্রেস ক্লাবকে সাংবাদিকদের দ্বিতীয় গৃহ বলা হয়। এই গৃহের সবাই সমাজ সচেতন, কলম সৈনিক। সবাইকে সে ভাবে গড়ে উঠতে হবে। দেশ ও জাতীর কল্যাণে নিজেদেরকে নিবেদিত রাখতে হবে।”

’৯৬ সালে পাইকগাছা প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম কচি ভাইকে পরিবর্তন করে গাজী সালাম ভাইকে দায়িত্ব দেয়ার পর ‘পাইকগাছা আঞ্চলিক অফিস’ উদ্বোধন করতে যাওয়ার পথে বালু ভাই, রফিক ভাই ও সাত্তার ভাই আমার বাসায় কিছুক্ষণ কাটান। পূর্ব থেকেই আমি মহাদেব সাধু, এমদাদ ও হেদায়েত ভাইকে বলে রাখি। ওনারা যথা সময়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে (সনি আর্ট প্রেস, মাদ্রসা মার্কেট) গিয়ে বসে ওনাদের সাথে আলাপ করে প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকতার উপর বই কেনার জন্য তাৎক্ষনিক ভাবে কিছু টাকা দিয়েছিলেন।
৬ ফেব্রয়ারী ’৯৯ সালে “রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু’র স্মৃতি চারণ ও পদক বিতরণ” এ মহতি অনুষ্ঠানের (সভাপতি, খুলনা প্রেস ক্লাব) প্রধান অতিথি বালু ভাই (সাধারণ সম্পাদক, খুলনা প্রেস ক্লাব) বিশেষ অতিথি মানিক চন্দ্র সাহাকে সাথে নিয়ে নির্দ্ধারিত সময়ের আগেই কপিলমুনিতে এসেছিলেন। উভয়ই আধুনিক কপিলমুনির রুপকার স্বর্গীয় দানবীর রায় সাহেবের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং ক্ষণজন্মা ঐ মহান পুরুষটির সুদূর প্রসারী চিন্তা চেতনার প্রশংসা করেন। তিনি কপিলমুনি ধান্য চত্তর (অনুষ্ঠান স্থল)কে ঐ দিনই “বিনোদ চত্ত্বর” নাম করণের নাম ফলক উন্মোচন করেন। বালু ভাই ঐ দিন অনুষ্ঠানের এলাকার ৬জন গুণী ব্যাক্তির মাঝে প্রথমবারের মত ‘বিনোদ স্মৃতি পদক’ বিতরণ করেন।
বালু ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদে কপিলমুনির অসংখ্যক মানুষ, অগনিত সংবাদকর্মী ও পাঠক, রাজনৈতিক, মুক্তিযোদ্ধারা যে ভীষনভাবে মর্মহত-শোক তাড়িত হয়েছিল তা সেদিন বাস্তবে উপলব্ধি করি। মানুষের মধ্যে যতই এ মর্মবেদনার বহিঃপ্রকাশ প্রত্যাক্ষ করেছিলাম, ততই ভেবেছিলাম এ দেশের মানূষ প্রতিভার মর্যাদা দিতে জানে, তারা কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা সর্বকিছুতেই আপ্লুত হতেও জানে। একজন সাংবাদিকের জীবনে এর চাইতে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে ? কোন রাষ্টীয় পদকের চাইতে এর মূল্যতো আসলেই লাখো গুন বেশী।

প্রতিনিয়ত এমনিভাবে কালের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের কত আপন জন, রয়ে যাচ্ছে অফুরন্ত নানা স্মৃতি- যা কখনো হাসায় আবার কখনো কাঁদায়। সদালাপি ও মিষ্ঠভাষী বালু ভাই সব সময় ভাবতেন আমাদের সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে, থাকবে শুধূ স্মৃুতি, তাই দেশ ও দশের জন্য কিছু করতে হবে। আগামী প্রজন্ম যেন তা দেখে শিক্ষা গ্রহন করতে পারে।

অন্যকে জানাতে শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
সুস্থ
মৃত্যু

বিশ্বে

আক্রান্ত
সুস্থ
মৃত্যু