আজ || মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২
শিরোনাম :
  শ্যামনগরে উত্তরণের বিশ্ব শিশু অধিকার সপ্তাহ উদযাপন       তালায় জাতীয় কন্যা শিশু দিবস পালিত       ‘অভিযোগ পেলেই কেবল ব্যবস্থা’       তালায় বিভিন্ন পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেন সংসদ সদস্য এ্যাড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ       তালায় সাবেক সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমানের পূজা মন্ডপ পরিদর্শন       তালায় বিভিন্ন পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস       তালায় বিভিন্ন পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির       সাংবাদিক তোয়াব খানের মৃত্যুতে তালা প্রেসক্লাবের শোক       তালায় কেন্দ্রীয় পানি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত       সাতক্ষীরায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে চ্যানেল আই’র ২৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন    
 


পরিবেশ বাচাতে ন্যাশনাল বিচ ক্লিনআপ অনুষ্ঠিত

মঙ্গলবার দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, সেভ আওয়ার সি এবং মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক এর যৌথ আয়োজনে কক্সবাজারের লাবনী বিচ পয়েন্টে ন্যাশনাল বিচ ক্লিনআপ। উক্ত অনুষ্ঠানে ঢাকা এবং স্থানীয় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রায় দুই শতাধিক লোক উপস্থিত ছিলো।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আ আ স ম আরিফিন সিদ্দিকী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শীতায় বিশাল সমুদ্র বিজয় আমাদের অনেক বড় বিজয়। এ সমুদ্র বিজয়কে অর্থবহ করতে হবে। এটাকে অর্থবহ করতে সমুদ্র বিষয়ক গবেষকদের ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের সমুদ্র সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, আর এ জন্যই মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক নামের এ সাংবাদিক সংগঠন এই সচেতনতা মূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
তিনি বলেন, ফ্লোরিডার মিয়ামি বিচ বিশ্বের অন্যতম একটি বিচ। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা যাচ্ছে, সিনেমার শুটিং চলছে। হাজার হাজার পর্যটকরা সেখানে যাচ্ছে। অথচ সেই বিচ আমাদের কক্সবাজারের বিচের তুলনায় কিছুই নয়। শুধুমাত্র আমাদের সমুদ্র ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাগত সমস্যার কারণে এটা হচ্ছে। এবার একটি সুযোগ এসেছে। আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমাদের জাতির জনক মুজিব শতবার্ষিকী আসছে। এটা কে সামনে রেখে আমাদেরকে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। বঙ্গবন্ধু কিভাবে বাংলাদেশকে বাঁচাতে চেয়েছিলো, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে নিয়ে তিনি সমুদ্র উন্নয়নে কি ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তিনি বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন গঠন করেছিলেন। মানতে কষ্ট হয় আজ যেসব স্থাপনা কক্সবাজার বিচের কাছাকাছি চলে এসেছে, তা যে কতটা অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি করেছে। স্থাপনা থাকতে পারে সেটার একটা লিমিট থাকা উচিত। মুজিববর্ষের অঙ্গীকার নিয়ে কক্সবাজারকে সুন্দর ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে এসে সমুদ্রকে দেশের কল্যাণে, জনকল্যাণে কাজে লাগাতে হবে।
তিনি আরো বলেন, একটি পৃথিবীতে আমরা দেশগুলো ভাগ করলেও প্রকৃতি কিন্তু বিভাজন মানে না। ভৌগোলিক সীমারেখা এটি মানে না। পাকিস্তান ও ভারতে বায়ু দূষণ ও সমুদ্র দূষণ বেড়ে গেলে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর বায়ু দূষণের ফলে আমাদের দেশে এর প্রভাব পড়ছে। ফলে তাদেরকে যেমন সচেতন থাকতে হবে তেমনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে অনেক উদ্বিগ্ন থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব জলবায়ু সংক্রান্ত সম্মেলন হয় সেখানে তিনি এসব নিয়ে কথা বলেন। সারা পৃথিবী সম্মিলিতভাবে ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে হবে।
তার বক্তব্যে তিনি আয়োজক সংগঠন সেভ আওয়ার সি কে ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হয়ে সমুদ্র বিজয় করে এনেছেন। একইভাবে তিনি সমুদ্রের দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা এসংক্রান্ত মেরিন বিভাগ খোলা হয়েছে। এছাড়াও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করেছেন তিনি। আমি এই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কে বলব প্রধানমন্ত্রী আপনাদেরকে এই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তুলে দিয়েছেন। এখানে আপনাদের কার্যক্রম পরিচালনায় কারা বাধা সেটা দেখার বিষয় নয়, এক্ষেত্রে আপনাদের একটি পরিকল্পিতভাবে এই সমুদ্র সৈকতটিকে কক্সবাজার পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ২০১৬ সালে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত মাষ্টার প্লান হয়নি, এই কথাটি আমরা শুনতে চাই না। আমরা চাই আগামীকাল থেকে আপনারা এখানে কাজ শুরু করবেন। কর্পোরেশন গঠন হওয়ার পর বিচ ম্যানেজমেন্টর জন্য আলাদা কোন কমিটি থাকার কথা নয়। সবকিছু উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আন্ডারে চলে আসার কথা। সমুদ্র উন্নয়নে কর্পোরেশনের সঙ্গে জড়িতদের যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে এমন কিছু করে দিয়ে যাবেন এলাকার জন্য, যাতে এলাকার মানুষ স্মরণ করে যে তাদের জন্য কিছু একটা করে দিয়ে গেছেন।

তার বক্তব্যে বলেন, সাংবাদিকদের যে সংগঠনটি আজকেরএই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে একটা সচেতনতামূলক পরিস্থিতি তৈরি করা এবং যেসব কর্তৃপক্ষ আছে তাদের যেসব গাফিলতি আছে তা মানুষের সামনে তুলে ধরা। আমি সাংবাদিকবন্ধুদের বলবো প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার উন্নয়নের তিন লক্ষ কোটি টাকার বাজেট পাস করেছেন। এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে সবধরণের স্থাপনার উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সারা বাংলাদেশের সঙ্গে কক্সবাজারের যদি উন্নয়ন করা না যায় তাহলে সারা বাংলাদেশের উন্নয়ন পূর্ণ হবেনা। এখানে যেসব সমুদ্র এবং পাহাড়ি সম্পদ রয়েছে এটা আমাদের পরিকল্পনার অভাবে যদি কাজে লাগাতে না পারে তাহলে এটি আমাদের বড় ব্যর্থতা।
কক্সবাজার জেলা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব আবু জাফর রশিদ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারকে শ্রেষ্ঠ পর্যটক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর সঙ্গে ২৪০ জন জনবল নিয়োগের অনুমতিও তিনি দিয়েছেন। বর্তমানে আমাদের প্রত্যক্ষ জনগণের সংখ্যা খুবই কম, অ্যাটাচমেন্ট জনবল দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। খুব শিগগিরই আমাদের প্রত্যক্ষ জনবল নিয়োগ হবে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে উদ্দেশ্যে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছেন তার বাস্তবায়ন হবে।
সেভ আওয়ার সি এর পৃষ্ঠপোষক আতিকুর রহমান বলেন, পর্যটকদের ফেলে রাখা ব্রজ সমুদ্রে চলে যায় ফলে সমুদ্রের প্রাণী গুলোর সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে সমুদ্রের সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। তিনি তার বক্তব্যে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কে কোরাল দ্বীপ না বলার জন্য সবাইকে অনুরোধ করেন।
তিনি বলেন, সেন্ট মার্টিন কোরাল দীপ নয়, সেখানে কোরালের উপস্থিতি রয়েছে মাত্র। সেন্টমার্টিনকে ছেড়া দ্বীপ বলা যাবেনা, বিশ্বের সবগুলো দিপ-ই ছেড়াদ্বীপ। শুধুমাত্র ব্যবসার জন্য এটাকে এভাবে ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে।
সভায় পর্যটন বিশেষজ্ঞ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি বিচ বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশের সম্পদ। কারণ কোন জায়গাকে পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণার পর সে জায়গায় এককভাবে কোন দেশের মালিকানায় থাকেনা। ফলে এই বিচ যাতে কোনরকম ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। এই বিচের জীবনচক্র যত দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারব ততদিন এর সুবিধা পাব। বিজ্ঞানীরা বলছে মাটির যাইতে সমুদ্রের তলদেশে সম্পদের পরিমাণ বেশি, ফলে সমুদ্রের সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সমুদ্র অর্থনীতি গবেষক ডক্টর দিলরুবা চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, পৃথিবীতে ব্লু ইকোনমি থেকে অর্থনীতি আসছে পাঁচ থেকে ছয় ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা যদি ব্লু ইকোনমি কে আরো বেশি এগিয়ে নিতে চাই পারি তাহলে এটা বেড়ে ১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। পর্যটন থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আয় করছে আমেরিকা। আমাদের দেশেও ট্যুরিজম এর সঙ্গে অনেক সেক্টর সম্পৃক্ত হয়েছে। ট্যুরিজম দিয়ে আমাদের জিডিপি তে কন্ট্রিবিউশন আরও বাড়াতে পারি। শুধুমাত্র গার্মেন্ট সেক্টরের উপর আমাদের আর নির্ভর করতে হবে না, আপনারা জেনেছেন ইতোমধ্যে গার্মেন্ট সেক্টর জিটিভিতে অংশগ্রহণে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। ফলে গার্মেন্ট শিল্পের প্রতি বেশি ঝুঁকে না গিয়ে সমুদ্র সম্পদের ওপর গুরুত্ব দিলে জিডিপিতে এর অংশগ্রহণ অনেক গুণে বেড়ে যাবে।
তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পর্যটক স্পেনে। সেখানে পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের এন্টারটেনমেন্টের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমরা বলব না যে এন্টারটেইনমেন্ট মানে হচ্ছে ক্যাসিনো। আমাদের পার্শ্ববর্তী মুসলিম কান্ট্রি মালয়েশিয়ায় যেভাবে পর্যটকদের জন্য এন্টারটেইনমেন্টের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তার আলোকে আমাদের দেশেও এন্টারটেনমেন্টের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। মালয়েশিয়ায় নাইট লং মার্কেট খোলা রাখা হয়, ফলে পর্যটকরা রাতভর কেনাকাটার সুযোগ পায়। এই সুবিধাগুলো আমাদের এখানেও চালু করতে হবে।
ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের হেড অব নিউজ মামুন আব্দুল্লাহ বলেন, আমাদের পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের আছে সেটা কি আমরা কাজে লাগাতে পেরেছি? এটা আমার প্রশ্ন। ২০ বছর আগে যে কক্সবাজারকে দেখেছি সেই কক্সবাজারকে আর এখন পাইনা। আমরা জানি গড়ে প্রতিদিন কক্সবাজারে এক লাখ পর্যটক আসে। তাদের আনা বর্জ্য কতটা আমরা সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারি? এজন্য এই বর্জ্যগুলো গরিয়ে গরিয়ে সমুদ্রে যাচ্ছে। ফলে আগের মত সেই নীল রঙ্গের পানি এখানে পাওয়া যায়না। পুকুরের পানির মতো হয়ে গেছে সমুদ্রের পানি।
তিনি বলেন, আমি একটি প্রস্তাব রাখতে চাই। আমরা যদি প্রতিদিন একজন পর্যটক থেকে এক টাকা করে নেই, তাহলে মাসে আমরা তিন লাখ টাকা পেতে পারি। বছরে ৩৬ লাখ টাকা হয়। এই টাকা দিয়ে আমরা বিচ ম্যানেজমেন্টে কাজে লাগাতে পারি।
অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি তারিখ সাঈদ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরেকটি সমুদ্র সৈকত করেছেন যার পরিমাণ আরেকটি বাংলাদেশের সমান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমুদ্র নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন, আপনাদেরকেউ এমন স্বপ্ন দেখতে হবে, দেশকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব আবু জাফর রশিদ, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মজুমদার, পরিসংখ্যান বিভাগের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মজুমদার, বন্যপ্রাণী ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের পরিচালক এএসএম জহির আকন্দ, বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাগর প্রমুখ।


Top