করোনায় কোরবানি এবং আমাদের অর্থনীতি

রিয়াদ হোসেন ::
  • প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। তবে গত বছর থেকে চলমান করোনা ভাইরাস এই আনন্দকে শূন্যের কোটায় নামিয়ে দিয়েছে। এ মাসের ২১ তারিখ উৎযাপিত হতে যাচ্ছে মুসলমানের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব কুরবানির ঈদ। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা দুটির মধ্যে যে বিশেষ পার্থক্য গড়ে সেটি হলো একটি রোজার আনন্দ ভাগাভাগি আর অন্যটি ত্যাগের মহিমায় পশু কুরবানি। কিন্তু এবারও বিশ্ব প্রেক্ষাপটের সাথে বাংলাদেশের পরিস্থিতিও পাল্টে গেছে সবই। ঘরে বাইরে সর্বত্রই করোনা আতঙ্ক। যার ফলে অর্থনৈতিক স্পন্দন যায় যায় অবস্থায়।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এবার কোরবানির পশুর ২৩টি অস্থায়ী হাট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বসবে ১৩টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বসবে ১০টি পশুর হাট।প্রথমদিকে অনলাইন হাটে বিকিকিনি চললেও শেষ সময়ে এসে স্বাস্থ্য বিধি মেনে সারাদেশে পশুর হাট বসানোর কথা বলেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। দেশে প্রতিবছর কুরবানিতে পশুর মোট চাহিদার অর্ধেকটা পূরণ করে থাকেন দেশীয় খামারিরা। বাকিটা আসে পাশের দেশ ভারত থেকে। তবে গতবছর ভারত থেকে অবৈধ পথে গরু কমে যাওয়ায় দেশীয় খামারিরা কিন্তু আরো বেশি আগ্রহ করে বাড়িয়ে দিয়েছিল পশু পালনে। যার একটাই উদেশ্য ছিল কুরবানীর ঈদে পশুগুলো ছেড়ে লাভবান হওয়ার। তবে ভাইরাসের উর্ধ্বমুখী সংক্রমনে সবকিছু স্থবিরতা বিরাজ করায় বিপাকে পড়েছে দেশীয় খামারিরা। সারা বছরের পালন করা গরু নিয়ে আশায় থাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা নিয়ে খামারিদের কপালে চিন্তার ভাজ।

দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলাগুলোতে দেখা গেছে, এলাকায় শ’ শ’ গো-খামার গড়ে উঠেছে। এমন কোনো বাড়ি নেই যেখানে ২-৪টি গরু পালন হচ্ছে না। গরু পালন করে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন অনেকেই। শুধু কুরবানি ঈদকে কেন্দ্র করেই বিগত এক দশকে গরু লালন পালন এবং কেনা বেচা করে বহু লোকজন নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন।এসব চিন্তা ভাবনাকেই কেন্দ্র এবছর আরো বেশি গড়ে উঠেছিল খামার। অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ সংগ্রহ করে গো-খামার গড়ে তুলেছিলেন। বে-সরকারি সংস্থা ওসাকা, নিউএরা ফাউন্ডেশন, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকে তারা স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে গরু পালন করেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে লাভজনক হওয়া তো দূরে থাক এসব ঋণ শোধ করায় যেন বড় কষ্টের হয়ে পড়েছে তাদের জন্য।

বিশেষ করে দেশীয় খামারের গরুগুলো যত্ন একটু দেরিতে শুরু হয়। খামারিরা কুরবানির ৬-৭ মাস আগে থেকেই জোর প্রস্তুতি শুরু করেন। কিন্তু বিগত বছর থেকে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। করোনা মহামারির এই সঙ্কটের কারণে ভেঙে গেছে অধিকাংশ খামারিদের মন। প্রতিবছরের পরিসংখ্যানের হিসাব দেখে অনুমিয় এবারও দেশের খামারগুলোতে প্রায় ৫০ লাখ গরু মোটাতাজাকরণের প্রস্তুতি ছিল। তবে করোনা, লকডাউনের প্রভাবে এই কাজে ভাটা পড়েছে। কুরবানির গরুর বাজার নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তাদের অর্ধেক গরু বিক্রি হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেক খামারি।

কুরবানীর পশু কেনাকাটা, চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ের ফলে ঈদুল আযহা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চামড়া প্রক্রিয়াকরণ, বাজারজাতকরণ এবং রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশের একটি চাহিদা গ্রহণযোগ্যতা অনেক আগে থেকেই রয়েছে। তবে করোনার প্রাদুর্ভাবে অর্থনীতির এই অংশে বিরাট একটি ধাক্কা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। যেটা ইতিমধ্য কিন্তু বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গনমাধ্যমে উঠে এসেছে। এদিকে গ্রামীণ পরিবেশে নিজেরা কুরবানী করার জন্য যেসব ছাগল গরু পালন করা হয়েছিল সেদিকে একটু স্বস্তি দেখা যাচ্ছে। তারা বলছে, লাভ লসের হিসাব নয় নিজেরা কুরবানী দিব বলে বাড়িতেই পালন করেছি। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্যেশেই কুরবানী দিব।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অস্থায়ী গরুর হাটের লাখ লাখ টাকা ইজারা নেওয়া ব্যবসায়ীরা বিরাট লোকসানের আশঙ্কা করছে। সরকারী নিদের্শনায় খুব কম সংখ্যকই অস্থায়ী গরুর হাট গুলো বসাতে পেরেছে। তবে বেশিরভাগ হাটের ইজারা নেওয়া ব্যবসায়ীদের মুলধন পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করছেন। সব মিলিয়ে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তির ছাপ পড়েছে করোনাকালীন এবারের কুরবানীর ঈদেও। একদিকে খামারিদের লোকসান অন্যদিকে চামড়ার বাজারে ধ্বস। এসবই দেশের অর্থনীতির জন্য অনেক বড় একটি ধাক্কা।

লেখক: রিয়াদ হোসেন
সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক, খুলনা

অন্যকে জানাতে শেয়ার করুন

আরও পড়ুন