আজ || সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২
শিরোনাম :
  বঙ্গবন্ধু পরিষদ খুলনা মহানগর শাখার সহ- বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন গৌতম       তালা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মহাবিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষার্থী ঢাবিতে চান্স পেয়েছে       তালা উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ হলেন যারা       তালায় গৃহশিক্ষককে না পেয়ে ঘর ভাংচুর!       সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে তালা সরকারি কলেজ সড়কে       তালায় মোটরসাইকেল চোর চক্রের দুই সদস্য গ্রেফতার       স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ’– বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত       তালা মহিলা কলেজ থেকে ঢাবিতে চান্স পেয়েছে সামিয়া ও প্রজ্ঞা       তালায় রথযাত্রা উৎসব শুরু       ঈদুল আজহা ১০ জুলাই    
 


একটু সুখের খোঁজে আর কত বছর ঘুরবে গোবিন্দ দাশ ?

রিয়াদ হোসেন: যে ভাইকে ভিক্ষা করে এনে লেখাপড়া শিখালাম, পরের বাড়ির ভাতের মাড় চেয়ে গালে তুলে খাওয়ালাম, যে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের সুখ-শান্তি সব বির্সাজন দিলাম সেই ভাই বাবার সব সম্পত্তি লিখে নিয়ে আমাকে বাড়ি থেকে বের দিলো। এটাই কি ভালোবাসা, স্নেহের প্রতিদান বাবা? – চোখের জল ছেড়ে দিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন নোয়াখালীর দক্ষিণ হাতিয়ার মৃত মহীন চন্দ্র দাশের বড় ছেলে গোবিন্দ দাশ (৮৬)।

সংসারে দুই বছরের এক ভাইকে রেখে মারা যায় গোবিন্দ দাশের বাবা-মামা। এরপর বিভিন্ন কলকারখানায় কাজ করে সংসার চালিয়ে বহু কষ্ট বড় করে তোলেন সেই ছোট ভাইকে। কিন্তু ভাগ্যের বিড়ম্বনায় এক সাথে আর থাকা হয়নি ছোট ভাইয়ের সাথে। বাবার রেখে যাওয়া জমিজমা নিয়ে এক বিরোধের জেরে সবকিছু ফেলে চলে আসেন চট্টগ্রাম শহরে। গ্রাম ছেড়ে যান্ত্রিক এই শহরে এসে খাপখাওয়াতে বেশকিছুটা সময় লেগে যায় তার। একটি সময় এসে অন্যের জমিতে কাজ করে, কখনও রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করলেন। কিন্তু সংসার থেকে সেই অভাব অনাটন আর ঘোচে নি। কখনও চাল থাকে তো ডাল থাকে না আবার কখনও তেল থাকলেও ঘরে চাল থাকে না। এভাবে বহু বছর বিভিন্ন কাজকর্ম করে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন রঙিন বেলুন বোর্ডে সেঁটে দিয়ে ‘বন্দুক দিয়ে বেলুন ফুটানো খেলা’ থেকে আয় করে জীবনযাপন করবেন।

১৪ জুন (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় দেখা হয় গোবিন্দ দাশের সাথে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ক্রেস ভর করে বন্ধুক ঘাড়ে নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তার সামনে দিয়ে পর্যাটকরা গেলে তিনি বলছেন, ‘মামা আসেন ! দশ গুলি মাত্র বিশ টাকা।’ কেউ এসে খেলছে আবার কেউ তাঁকিয়ে চলে যাচ্ছে সমুদ্র বিলাসে। সকাল থেকে তিনি বিভিন্ন রঙবেরঙের বেলুন ফুলিয়ে বোর্ডে সেট করে অপেক্ষায় থাকেন পর্যটকদের জন্য। বেশিরভাগ সময় এই পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বন্দুক আর বোর্ড নিয়ে খেলার আয়োজন করেন। তবে শহরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মেলা, ওয়াজ মাহফিল, বলি খেলাসহ বিভিন্ন জায়গায়ও এ আসর বসান তিনি। দেখতে দেখতে এ পেশাতেই কাটিয়ে দিয়েছেন ৩৭ বছর। বয়সের ভারে এখন আর অন্য পেশায় যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও সুযোগ নেই তার। সারাদিনে দুই’শ তিন‘শ টাকা আয় হয়। তা দিয়ে খুব কষ্টে সংসার চালান। তবে সরকারি ছুটির দিন এবং শুক্রবারে সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা বেশি হওয়ায় আয় রোজগার কিছুটা ভালো হয় তার। তবে সারা মাসে যে রোজগার হয় তাতে কোন ভাবেই যেন চলতে চায় না তার সংসারটি। তবুও উপায় না থাকায় বাধ্য হয়ে এ পেশাতেই রয়ে গেলেন তিনি।

গোবিন্দ দাশ বলেন, সেই ছোটকালে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে এই বুড়ো বয়স পর্যন্ত এখনও কাজ না করলে পেটে ভাত যায় না। কোনদিন অসুস্থ হলে চিকিৎসা তো দূরের কথা পরেরদন কি খাবো তা ঘরে থাকে না। সারাটা জীবন এই অভাব অনাটন আমার পিছন ছাড়লো না। একটা সময় গেছে আমরা গরীব বলে আমাদের আত্মীয়স্বজনরা আমাদের পরিচয় দিত না লজ্জায়। পরের বাড়ি কাজ করে, ভাত চেয়ে খেয়ে বড় হয়েছি। ছোট ভাইকে মানুষ করেছি সেও আমার সাথে বেঈমানী করলো। জীবনটাই কেটে গেল দুঃখ কষ্টে। সুখ খুঁজতে খুঁজতে জীবনের এই বয়স হলো তবুও একটু সুখের দেখা পেলাম না। বিধাতা হয়তো সুখ আমার জন্য রাখেনি। তবুও তার প্রতি আমার কোন আক্ষেপ কিংবা অভিযোগ নেই। আমি আজও বিশ্বাস করি তিনি যা করেন তা আমাদের মঙ্গলের জন্য করেন।’ এসব কথা বলতে বলতে ‘সত্যিই কি বাবা জীবনে আমি কোনদিন সুখের মুখ দেখবো না?’ প্রশ্ন করে আবেগাপ্লুত হয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেন গোবিন্দ দাশ।


Top